২৬শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার,সকাল ৮:৪৭

স্ট্রোক এর কারণ ও প্রাথমিক পরিচর্যা

প্রকাশিত: নভেম্বর ৯, ২০২১

  • শেয়ার করুন

 

প্রতি দুই সেকেন্ডে এই পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে কেউ না কেউ স্ট্রোক করছেন এবং পৃথিবীতে প্রতি ছয়জন মানুষের মাঝে একজন তার জীবনের যে কোন একটা পর্যায়ে এসে স্ট্রোক করেন। স্ট্রোক মানে হলো আমাদের মস্তিষ্কের মাঝে অক্সিজেনের সাপ্লাই কমে যাওয়া এবং এটা আমাদের পৃথিবীতে মৃত্যুর খুব সাধারণ কারণগুলোর মাঝে একটা। মৃত্যুর পাশাপাশি এটা মানুষকে বিকলাঙ্গ করে দেয় এবং ব্যাক্তির কর্মজীবনের ইতি টানে।

কেউ স্ট্রোক করলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাটা খুবই জরুরি।এই সিদ্ধান্ত যতো দ্রুত নেওয়া যাবে, মস্তিষ্কের ক্ষতি হবার সম্ভাবনাও ততো কমে আসবে।

#যে_কারণে_স্ট্রোক_সংগঠিত_হয়ঃ

আমাদের মস্তিষ্ক সারা শরীরের ওজনের মাত্র দুই ভাগ বহন করে থাকে। কিন্তু এই ছোট্ট যন্ত্রটি সারা শরীরের মোট অক্সিজেনের বিশ ভাগকে একাই খরচ করে থাকে। অক্সিজেন রক্তের মাধ্যমে কিছু রক্তনালী বেয়ে যেমন-Carotid Artery, Vertebral Artery হয়ে ব্রেইনে প্রবেশ করে। Carotid Artery আমাদের মস্তিষ্কের সামনের দিকে অংশে এবং Vertebral Artery মস্তিষ্কের পেছনের দিকের অংশে রক্ত চলাচল বজায় রাখে। Vertebral এবং Carotid Artery একসাথে যোগ হয়ে ব্রেইনের ভেতরে একটা কাঠামো তৈরি করে, একে আমরা বলি Circle Of Willi যেটা পরবর্তীতে অনেকগুলো ছোট ছোট শাখায় বিভক্ত হয়ে পুরো মস্তিষ্কের বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরনে অক্সিজেন, গ্লুকোজের সাপ্লাই দিয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটায়।

যদি এই রক্তনালিকাগুলো দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে না পারে কিংবা আংশিক প্রবাহিত হতে পারে, তাহলে মস্তিষ্কের কোষগুলো ঠিকমতো অক্সিজেন পায়না৷ তখন মস্তিষ্কের কোষগুলো অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুবরণ করে।

দুইটা পদ্ধতিতে এই পুরো ব্যাপারটা ঘটতে পারেঃ

1)#Hemorrhagic_Stroke: যখন কোন রক্তনালি ছিদ্র হয়ে যায় এবং সেই ছিদ্র দিয়ে রক্ত Leak হয়। এটা তুলনামূলকভাবে কম ঘটে।

2)#Ishchemic_Stroke: এটা খুব বেশি ঘটে থাকে। যখন রক্তনালী ব্লক হয়ে যায় কিংবা রক্ত প্রবাহিত হতে পারেনা ঠিকমতো রক্তনালি দিয়ে তখন Ishchemic Stroke হয়। রক্তনালী যে উপাদান গুলো জমে ব্লক/বন্ধ হয়ে যায়, একে আমরা বলি Clot।

হার্টের চারটা চেম্বার থাকে।কোন কারণে উপরের চেম্বার গুলো যদি ঠিকমতো কাজ না করতে পারে, রক্তপ্রবাহ ধীর গতিসম্পন্ন হয়ে যায়। ফলে Platelet, Clotting Factor, Fibrin একসাথে মিলে গিয়ে তৈরি করে Clot।এই Clot হার্ট থেকে রক্তের মাধ্যমে ভেসে গিয়ে সোজা চলে যেতে পারে মস্তিষ্কে। Clot মস্তিষ্কের রক্তনালীতে আটকে যায়, এই ঘটনাটাকে বলা হয় Embolism।এতে রক্ত সামনের দিকে যেতে পারেনা, ফলে অক্সিজেন সাপ্লাই পায়না মস্তিষ্কের কোষগুলো।

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোতে কোন পেইন রিসেপ্টর নেই। তাই রক্তনালি গুলো ব্লক হয়ে গেলেও ব্যাক্তি ব্যাথা অনুভব করেন না। কিন্তু অক্সিজেনের সাপ্লাই কমে যাওয়ায় মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। এটা হঠাৎ দেখা দিতে পারে এবং সবাই বুঝতে পারে যে কিছু একটা ওলট-পালট হচ্ছে।

যেমন, যদি মস্তিষ্কের স্ট্রোকের জায়গাটা কথা বলার সেন্টার(Speech Center)হয়, তাহলে ব্যাক্তির কথা জড়িয়ে আসবে। যদি মস্তিষ্কের স্ট্রোকের জায়গাটা ব্যক্তির পেশিকে নিয়ন্ত্রণ করে তেমন কোন জায়গা হয়, তাহলে পেশিগুলো দুর্বল হয়ে যাবে। এটা শরীরের যে কোন এক সাইডের পেশি হবার সম্ভাবনা বেশি।

স্ট্রোক হবার সাথে সাথে আমাদের মানবদেহ চায় সেটাকে যতটুকু সম্ভব দমিয়ে রাখতে (Compensate করতে)। তাই শরীরের সিস্টেমগুলো তখন বেশি বেশি রক্ত প্রবাহ ঠেলে দিতে চায় ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্কের অংশে। কিন্তু এই অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ তেমন কোন ভালো ফলাফল তখন আর আনতে পারেনা। আস্তে আস্তে অক্সিজেন না পেয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলো মারা যেতে থাকে, ফলে Permenant Brain Damage হতে পারে। এই কারণেই স্ট্রোকের পেশেন্টদের খুব দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরী।

#Treatment_Of_Stroke:

প্রথমতো, Clot টাকে সরানোর জন্য একটা Intravenous Medication দেয়া হয়, যেটা হলো #Tissue_Plasminogen_Activator(TPA)।এটা Clot কে ভেঙে ফেলে এবং রক্ত চলাচলকে স্বাভাবিক করে দেয়। এটা যদি স্ট্রোকের কয়েক ঘন্টার মাঝে দেয়া যায়, তখন আক্রান্ত ব্যাক্তি ক্ষতির মুখ থেকে অনেকাংশেই বেঁচে ফেরে।

যদি Tissue Plasminogen Activator দেয়া না যায়; যেমন রোগী কিছু ওষুধ আগে থেকে নেবার কারণে কিংবা রোগীর আগে কোন অত্যধিক রক্তপাতের হিস্ট্রি থাকলে, কিংবা Clot টা যদি অনেক বড় হয়ে থাকে; সে সেক্ষেত্রে ডাক্তাররা #Endovascular_Thrombectomy করে থাকেন।

এক্ষেত্রে, একটা Dye(রং)ব্যাবহার করা হয়, যেটা রক্তে প্রবেশ করে মস্তিষ্কের কোন জায়গায় ব্লক আছে সেটা এক্সরে তে তুলে ধরতে সাহায্য করে। ডাক্তার একটা চিকন ফ্লেক্সিবল টিউব যেটার নাম ক্যাথেটার(Catheter), প্রবেশ করান পায়ের রক্তনালির ভেতর দিয়ে। সেটা পুরো রক্তনালী হয়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে, যেখানে ব্লকটা আছে ঠিক সে জায়গায়। সেই ক্যাথেটার এর ভেতরে একটা Retriever প্রবেশ করিয়ে পাম্পিং করে Clot টাকে টেনে বের করে আনা হয়। এতে রক্তপ্রবাহ পুনরায় স্বাভাবিক হয়ে আসে। এই পদ্ধতিটা যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে হয়, যাতে মস্তিষ্কের ক্ষতিটা এড়ানো যায়।

যেভাবে বোঝা যাবে একজন ব্যাক্তি স্ট্রোক করতে যাচ্ছেন,F.A.S.T টার্মটা দিয়ে মনে রাখি আমরাঃ

1)#Facial_Drooping: ব্যাক্তিতে হাসতে বললে ব্যাক্তির মুখের পেশিগুলো দুর্বল থাকায় হাসিটা ঠিকমতো প্রকাশ পাবেনা, মুখের একপাশ বেঁকে যেতে পারে।

2)#Arm_Weakness: ব্যাক্তিকে হাত উপরে তুলতে বললে, সে যদি অক্ষম হয়,সেটাও পেশির দুর্বলতা প্রকাশ করবে এবং স্ট্রোকের লক্ষণ।

3)#Speech: তাদেরকে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে, কথা বলতে গিয়ে যদি শব্দগুলো জড়িয়ে যায়, তাহলেও স্ট্রোকের লক্ষণ।

4)#Time: উপরের লক্ষ্মণ গুলো প্রকাশ পেলে যতো দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

যাদের স্ট্রোক হবার সম্ভাবনা বেশি থাকেঃ

a)Hypertension/High Blood Pressure

b)Smoking

c)Diabetes

d)High Cholesterol Level

#Recovery_Of_Stroke: ধীরে ধীরে স্ট্রোক সেরে উঠতে পারে ব্যাক্তি বিশেষে। অনেকের মস্তিষ্কের কিছু অংশে ক্ষতি হয়ে যায়, অনেকেই ভালো হয়ে ওঠে অনেকটাই। কিছু থেরাপি যেমন-Speech Therapy,Physical Therapy,Occupational Therapy কারো কারো ক্ষেত্রে কাজে দেয়। Depression দেখা দিতে পারে আক্রান্ত ব্যাক্তির ক্ষেত্রে, যেটা কাটিয়ে উঠবার জন্য তাকে মানসিক ভাবে মনোবল দিতে হবে আশেপাশের মানুষদেরকেই।

  • শেয়ার করুন